ধর্ম কেন এবং কীভাবে পালনীয়?
(১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সূর্যসেন পার্ক শ্রী শ্রী হরিচাঁদ সেবা সংঘের ৪৪ তম মতুয়া ধর্ম সম্মেলন ও লোকসংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্য)
সম্মানীয় সভাপতি, মঞ্চে উপবিষ্ট গুণীজন, সামনে উপবিষ্ট মা, বোন, ভাই এবং সন্তানসমান ছেলেমেয়েরা, সর্বোপরি আমার এই কণ্ঠস্বর মাইক্রোফোনের মাধ্যমে যাদের কান পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে, তাদের সকলকে আমার আন্তরিক প্রীতি, শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।
আজ আমরা শ্রী শ্রী হরিচাঁদ সেবা সংঘের ধর্ম সম্মেলনে উপস্থিত হয়েছি। কিন্তু প্রশ্ন হল, কেন হয়েছি? এই কেন-র সঠিক উত্তর যদি আমার আপনার জানা না থাকে, তাহলে এই সম্মেলনে আসার যে উদ্দেশ্য, তা ব্যর্থ হবে। আসুন আমরা বোঝার চেষ্টা করি।
আমরা সবাই জানি, এই ধরনের ধর্ম সম্মেলনে কিংবা মন্দির মসজিদে আমরা কেন যাই। যাই আমাদের মত প্রান্তিক ও নিম্নবর্গের (নিম্নবর্ণ কথাটা আমি ব্যবহার করি না) মানুষের দুঃখ দুর্দশা ঘোচানো এবং সুখী হওয়ার বাসনায়। আল্লাহ বা ভগবান এই কাজে আমাকে সাহায্য করবেন— এই আশায়। কিন্তু আমাদের সমস্যা হল, আমরা জানি না, আমার-আপনার ভগবান কিম্বা আল্লাহ ঠিক কী করলে সত্যি সত্যিই খুশি হন। কারণ, আমরা এ বিষয়ে পড়াশুনাই তো করি না! যা করি, তা হল কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে শুনে নেওয়া ধর্ম বিষয়ক আচরণ। এ প্রসঙ্গে হরিচাঁদ ঠাকুরের একটি কালজয়ী বাণী আমার খুব মনে পড়ছে। আমরা কমবেশি সবাই সেকথা শুনেছি। কিন্তু তার অন্তর্নিহিত অর্থ আমরা কজন বুঝতে পেরেছি? কিম্বা তা কতটা মানছি —এ নিয়ে বা ক’জন ভাবছি? আমার মনে হয়, অনেকই ভাবছি না। তিনি তাঁর অনুসারীদের উপদেশ দিয়েছিলেন, ভিক্ষা করে হলেও তুমি তোমার সন্তানদের লেখাপড়া শেখাও। বুকে হাত দিয়ে বলুনতো, তাঁর এই কথা আমরা কজন মন থেকে মানি। যদি ধর্মগুরুর উপদেশটাই আমি না মানলাম, তাহলে তাঁর কাছে এসে কান্নাকাটি করে তাঁর মন পাওয়া কীভাবে সম্ভব? সম্ভব নয়।
এখন কেউ কেউ বলবেন, আমি নিজে তো লেখাপড়া শিখেছি। আমার সন্তানকেও লেখাপড়া শিখিয়েছি। যদি শিখে থাকেন, আপনার মনের চাওয়া ঠিক ততটাই পূর্ণ হবে, যতটা আপনি শিখেছেন অর্থাৎ শিক্ষিত হয়েছেন। এখন প্রশ্ন হল আমরা কতটা শিখেছি? অর্থাৎ কতটা শিক্ষিত হয়েছি? এখানেই লুকিয়ে রয়েছে হরিচাঁদ ঠাকুরের কথার অন্তর্নিহিত অর্থ।
আসুন একটা উদাহরণের সাহায্য নেওয়া যাক। তার আগে বলে নেই, লেখাপড়া শেখা বলতে আমরা ঠিক কী বুঝি। স্কুল-কলেজে লেখাপড়া শেখা এবং বছর শেষে একটি ডিগ্রী প্রাপ্তির শংসাপত্র নিয়ে আমরা বাড়ি ফিরি। এবং আমরা ভাবি যে, আজ থেকে আমি শিক্ষিত। শুধু আমি ভাবি তাই নয়, আমার পরিবার, আমার সমাজ, আমার রাষ্ট্রব্যবস্থা —এভাবেই আমাকে ভাবতে শিখিয়েছে। আমার সাফল্যের জন্য এটাকেই তারা একমাত্র মাপকাঠি বানিয়েছে। মনে রাখতে হবে, এই ভাবনার গোড়ায়ই রয়েছে গলদ।
কীভাবে? আসলে আমরা লেখাপড়া ও শিক্ষাকে সমার্থক বানিয়ে ফেলেছি। লেখাপড়া শেষে সার্টিফিকেট প্রাপ্তিকেই আমরা শিক্ষা বলে অভিহিত করেছি। কিন্তু এটা ঠিক নয়। লেখাপড়া হলো শিক্ষা অর্জনের একটা মাধ্যম মাত্র। লেখাপড়ার মধ্য দিয়ে শিক্ষা অর্জন দ্রুত করা যায়। এখানেই লেখাপড়ার গুরুত্ব। আমার সামনে বসে থাকা যে সব মায়েরা বসে আছেন, তাঁরা অনেকেই হয়তো লেখাপড়া জানেন না। কিন্তু অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে, যে এদের অনেকেই এত সুন্দর এবং স্বাস্থ্যকর খাবার রান্না করতে পারেন, যা একজন হোটেল ম্যানেজমেন্ট পড়ে আসা শেফ পারবেন না। প্রশ্ন করুন তো নিজের কাছে, এটা কি শিক্ষা নয়? এই শিক্ষার জন্য তাঁর কোনও সার্টিফিকেট প্রয়োজন হয়েছে? হয়নি। কারণ, তিনি স্বশিক্ষিত। অর্থাৎ নিজে নিজেই শিখেছেন।
এখন আপনি যদি সবকিছুই নিজে নিজে শিখতে চান, তাহলে আপনার সারা জীবনের যে অর্জন হবে, তা হবে একেবারেই মামুলি (সামান্য) পরিমাণ। কিন্তু আমি আজ ৫৬ বছর বয়সে লেখাপড়া শেষে, পড়াশোনা এবং সঙ্গে দেখাশোনার মধ্য দিয়ে যে শিক্ষা অর্জন করেছি, তা যদি স্বশিক্ষার মাধ্যমে কেউ অর্জন করতে চান, তাহলে তাকে ৫৬ বছর অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু এই শিক্ষা যদি আমার ছাত্র ছাত্রীরা স্কুল-কলেজের মাধ্যমে ঠিকঠাকভাবে গ্রহণ করে, তবে সে ১৫-২০ কুড়ি বছরের মধ্যেই তা অর্জন করে ফেলবে। এখানেই লেখাপড়ার গুরুত্ব।
এবার ধরুন, আপনি একটি নদী পার হবেন, আপনি সাঁতার কেটে এ কাজ করতে পারেন। নৌকায় চড়েও এ কাজ করতে পারেন, আবার স্পিডবোর্ডের মাধ্যমেও ওপারে পৌঁছাতে পারেন। ওপারে পৌঁছানোটাই আপনার লক্ষ্য। কারণ, ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা জন্তুটি ঠিক কী, গাধা না ঘোড়া, তা আপনি বুঝতে চান এবং ন্যায্য দাম দিয়ে তা কিনতে চান। ওপারে পৌঁছালেই কেবল আপনি এই সত্য উপলব্ধি করতে পারবেন। এই সত্য উপলব্ধিটাই হল শিক্ষা। এই শিক্ষাটা দ্রুত সম্ভব হবে স্পিডবোটে পৌঁছানোর চেষ্টা করলে। আমরা স্কুল কলেজে যাই, এই স্পিডবোটে চলার ফায়দা নেওয়ার জন্য।
এখন প্রশ্ন হল, ওপারে পৌঁছালেই আপনি কি জন্তুকে চিনতে পারবেন? উত্তর হল, না। এর জন্য প্রয়োজন হল গাধা ও ঘোড়ার মধ্যে সাদৃশ্য এবং বৈসাদৃশ্য জানা, বোঝা এবং তাকে প্রয়োগ করে সত্যিকার ঘোড়াটাকে খুঁজে বের করার সক্ষমতা। এই সক্ষমতাই (সত্য উপলব্ধির সক্ষমতা) হল শিক্ষা। আমরা স্কুল কলেজে গেলাম, অনেক নতুন নতুন বিষয় জানলাম। মুখস্থ করে খাতায় লিখলাম। প্রশ্ন কমন পড়ায় দারুন রেজাল্ট করে একটা সার্টিফিকেট পেলাম। প্রশ্ন থেকে গেল না, শিখলাম কতটা? আসলে লেখাপড়া শিখলাম প্রমাণ হলো। কিন্তু শিক্ষিত হলাম কিনা তা প্রমাণ হলো না। শিক্ষিত প্রমাণ করতে গেলে, যা জানলাম তা বুঝতে হবে এবং বুঝতে পারার শেষে তাকে প্রয়োগ করে সাফল্য পেলাম কিনা তা প্রমাণ করতে হবে। সাফল্য যদি প্রমাণ হয়, তবে ওই বিষয়ে আপনি শিক্ষিত হয়ে গেলেন। আপনি কি এভাবে শিক্ষিত হয়েছেন? যদি হয়ে থাকেন, তবেই আপনি হরিচাঁদ ঠাকুরের ভিক্ষা করেও লেখাপড়া শেখার গুরুত্ব বুঝতে পারবেন। যেদিন বুঝতে পারবেন, মনে রাখবেন সেদিন আপনি আপনার হরিচাঁদকে পেলেন। তাঁর নামে মন্দির বানিয়ে, আপনি যত কান্নাকাটিই করুন না কেন, তিনি মুখ তুলে চাইবেন না। কারণ, তিনি যে কর্তব্য আপনাকে করতে বলেছেন, তা আপনি সঠিকভাবে করছেন না।
ধরুন আপনি ভয়ংকর দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ঠাকুরের কাছে এসেছেন। কান্নাকাটি করছেন, দুর্দিন কেটে যাওয়ার আশায়। জেনে রাখুন, এই দুর্দিন আপনার কাটবে না। কারণ আপনি তাঁর মূর্তি বানিয়ে পূজা করছেন বটে, কিন্তু এই দুর্দিন কাটানোর জন্য দেওয়া তাঁর পরামর্শ আপনি মানছেন না। আপনি যদি সত্যিই শিক্ষিত হতেন, তাহলে বুঝতে পারতেন, আপনার দারিদ্রতার কারণ আপনার ঠাকুর বা আমাদের আল্লাহ নয়। এর কারণ, আমাদেরই সমাজে ঘাপটি মেরে থাকা কিছু চালাক বা চতুর মানুষ। (এদেরকে আমি বুদ্ধিমান বলিনা। কেন বলি না, সে প্রসঙ্গে আমি এখন যাবো না।) তারা আপনাকে বোঝায়, এর জন্য উপরওয়ালাই দায়ী। মন্দির মসজিদে গিয়ে তাকে ডাকলেই কেবল এই সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু সেই উপরওয়ালার গ্রন্থ বলে যেগুলোকে আমরা মানি, তা যদি পড়তাম, এবং প্রকৃত ধর্মশিক্ষা অর্জন করতে পারতাম, তাহলে বুঝতে পারতাম, এই ধর্মগ্রন্থগুলোর সিংহভাগই এই চালাক ও চতুর মানুষদের তৈরি। তৈরি করা হয়েছে আমাদের ধোকা দেওয়ার জন্য। বিশ্বাস হচ্ছে না তো! যদি বিশ্বাস না করেন, যানবেন আপনি প্রকৃত ধর্মের পথে হাঁটতে শুরু করেছেন। কারণ, অন্ধবিশ্বাস অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। তার চেয়ে ভালো, চিন্তা করা।
এবার চিন্তা করুন, উপরওয়ালা আপনাকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। হ্যাঁ, খালি হাতেই পাঠিয়েছেন বটে, কিন্তু মনে রাখুন, খালি মাথায় পাঠাননি মোটেও। আপনার মাথায় চিন্তা করার সক্ষমতা দিয়ে পাঠিয়েছেন। আপনার অধিকার বুঝে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই এই সক্ষমতা তিনি আপনাকে দিয়েছেন। এই চিন্তা শক্তিকে কাজে লাগান, দেখতে পাবেন, এক অপার রহস্যে মোড়া এ পৃথিবীকে আপনি কতটা ভুল ভাবে দেখছেন! শুধু দেখছেন না, মেনেও নিচ্ছেন ভগবানের শাস্তি হিসেবে। অথবা ভগবানের কৃপা লাভের আশায়।
একটা উদাহরণ নেওয়া যাক। ধরুন আপনার সামনে এক গামলা মাটি আছে। মাটিটুকু নিয়ে যদি আপনি কাউকে বলেন, এটা নিন এবং আমাকে ৫০ টাকা দিন। কেউ কি দেবে? দেবে না। কিন্তু একটা ইট এনে যদি বলি, এটার যা মূল্য হয় আপনি তা আমাকে দিন। তিনি নিন আর না নিন, এটার যে একটা মূল্য আছে, তা কিন্তু তিনি অস্বীকার করবেন না। এখন এই মূল্যটা এলো কোথা থেকে! আপনি যাকে ঈশ্বর বলে মানেন, তার দেওয়া চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেখুন, এটা এসেছে আপনার আমার মত প্রান্তিক মানুষের মেধা এবং শ্রমের বিনিময়ে। তার মেধা তাকে বলে দিয়েছে, এক্ষেত্রে কতটা জল দিতে হবে, কতটা সময় দিতে হবে, কীভাবে তাকে মল্চাতে হবে, কীভাবে তাকে একটি ইটের চেহারা দিতে হবে এবং কতদিন রোদে শুকাতে হবে, কতক্ষণ তাকে আগুনে পোড়াতে হবে ইত্যাদি...। অন্যদিকে তার দৈহিক শ্রম এই কাজ করতে সাহায্য করেছে। এই মেধা এবং শ্রম আসলে এক গামলা মূল্যহীন মাটিকে সম্পদে রূপান্তরিত করেছে। তাই তার মূল্য তৈরি হয়েছে। তাহলে এই সম্পদের আসল মালিক কে? এর আসল মালিক হচ্ছেন একজন প্রান্তিক খেটে খাওয়া মানুষ। কিন্তু আমরা কী ভাবি? আমরা ভাবি ইটভাটার মালিক। ভুল বললাম?
এবার ভাবুন পৃথিবীর এমন কোন সম্পদ আছে যা খেটে খাওয়া মানুষের মেধা এবং শ্রম বিবর্জিত। অর্থাৎ যেখানে আপনার মেধা এবং শ্রম লাগেনি? একটিও পাবেন না। আপনি কি কোনদিন প্রশ্ন তুলেছেন এটা কেন হলো? কে করল? কীভাবে করল? আপনার ভগবান বা আমার আল্লাহ কি এর জন্য দায়ী। হ্যাঁ, আপনি আমি এভাবেই ভাবি। বিশ্বাস করি ঈশ্বরই এর জন্য দায়ী। বিশ্বাস করি তাঁকে আরাধনা করলেই আমার এই দুঃখ দুর্দশার অবসান ঘটবে। কিন্তু ভেবে দেখুন তো, ভগবান কি আপনাকে এভাবে শুধু বিশ্বাস করতে বলেছেন? প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মতত্ত্ব যদি আপনি ঘাটেন তাহলে দেখবেন সে কথাই সেখানে লেখা আছে। এবার ভগবানের দেওয়া আপনার চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগান, আর দেখার ও বোঝার চেষ্টা করুন এই কথাগুলোর কতটা সত্য কিম্বা কতটা বানানো!
আপনি আপনার চোখের পাতা ফেলছেন। আমরা যাকে পলক পড়া বলি। আপনি চাইলে এটাকে বন্ধ রাখতে পারবেন? আপনি কখনো দেখেছেন, বাতাস হচ্ছে না, অথচ গাছের পাতা নড়ছে। বৃষ্টি আকাশ থেকে পড়ছে না, মাটি থেকে উপরে উঠছে। দেখেননি। যদি আপনি কোনও ব্যতিক্রম দেখেও থাকেন, দেখবেন যে, যেখানে তা ঘটছে, সেখানে তার উল্টোটা কখনও ঘটছে না। প্রশ্ন করুন, কেন উল্টোটা হয় না! হয় না তার কারণ, আপনি যাকে ভগবান বা আল্লাহ বলেন, তিনি এ পৃথিবীর সমস্ত কিছুকে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম দ্বারা পরিচালিত করছেন। এই নিয়ম মানে হল কার্যকারণ সম্পর্কের বন্ধন। অর্থাৎ যেখানে যাই ঘটুক (কার্য) তার পিছনে ঈশ্বর একটা কারণকে জুড়ে দিয়েছেন, যা আসলে কার্যের সঙ্গে কারণের পারস্পরিক প্রভাবিত করার সম্পর্কে সম্পর্কযুক্ত।
স্বয়ং ঈশ্বর (প্রতিষ্ঠানিক ধর্মে অবিশ্বাসীরা তাকে বলেন প্রকৃতি) যখন সমস্ত কিছুকে নিয়মের দ্বারা পরিচালিত করছেন, অর্থাৎ আপনার বিশ্বাসের দ্বারা পরিচালিত করছেন না, তখন আপনি বিশ্বাস করছেন কেন যে তাঁর প্রতি বিশ্বাসের দ্বারাই একমাত্র তাঁকে পাওয়া যাবে? কীভাবে বিশ্বাস করছেন, এভাবে পাওয়ার চেষ্টা করাটাই আসল ধর্ম? আসলে আপনার ধর্ম হল ভগবান বা আল্লাহ যে নিয়ম তৈরি করেছেন, সেই নিয়মগুলো জানা, বোঝা এবং সেগুলোকে প্রয়োগ করে সাফল হওয়ার সক্ষমতা অর্জন করা। শুধুমাত্র বিশ্বাস করা নয়। অর্থাৎ নিজের ভাগ্য নিজের শিক্ষা ও কর্মের দ্বারা পরিবর্তন করাই হল আপনার ধর্ম। এটাই ঈশ্বরের বিধান। এটা মেনে চলাই হল ঈশ্বরকে মানা। লেখাপড়া শেখা ও পড়াশোনার মাধ্যমে এই সত্য উপলব্ধি ও সক্ষমতা অর্জন করার নামই হল শিক্ষা। সুতরাং এই শিক্ষা অর্জন করার চেষ্টা করাটাই হল ধর্ম পালন করা। এখানেই হরিচাঁদ ঠাকুরের শিক্ষা সংক্রান্ত এই বাণীর মর্মার্থ।
এখন আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, হরিচাঁদ ঠাকুর তাঁর দ্বাদশ আজ্ঞায় হরিমন্দির প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন কেন? আপনারা হয়তো জানেন যে, প্রতিটি শিক্ষালয়কে মন্দির বা মসজিদের সঙ্গে তুলনা করা হয়। কেন হয়? এর ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা যদি আপনার কাছে থাকে, তবে এই মন্দির প্রতিষ্ঠার কথা ও তার প্রকৃত তাৎপর্য আপনি বুঝতে পারবেন। যদি না বুঝতে পারেন তাহলে আপনি অন্ধকারে পথ হাঁটছেন। মন্দির এবং মসজিদ তৈরীর ইতিহাস যদি আপনি একটু ঘাটেন তাহলে দেখবেন এগুলি ছিল আসলে এক একটি শিক্ষালয়। শিক্ষা অর্জনের জন্যেই মানুষ এখানে যেতেন।
প্রাচীন মিশরের পার-আঙ্ক (হাউস অফ লাইফ) মন্দিরের অভ্যন্তরটি উচ্চশিক্ষার প্রসার ঘটানোর এবং পেশাদারদের (চিকিৎসক, স্থপতি) প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। প্রাচীন মেসোপটেমিয়া এদুব্বা (ট্যাবলেট-গৃহ) প্রথমে মন্দিরে, পরে স্বতন্ত্র ভবনে লেখক তৈরি করা; কঠোর শৃঙ্খলা; বহুমুখী পাঠ্যক্রম পরিচালনা করা হতো।
ভারতীয় উপমহাদেশেও মুসলিম শাসকগণ মক্তব ও মসজিদভিত্তিক প্রাক-প্রাথমিক ও কুরআন শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসারে মনোযোগী ছিলেন । অন্যদিকে, মন্দির ও বৌদ্ধ বিহারগুলোও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সংস্কৃত, পালি ও স্থানীয় ভাষায় ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ জ্ঞানচর্চার পীঠস্থান হিসেবে কাজ করেছে। আর্যভট্ট থেকে শীলভদ্র এইসব প্রতিষ্ঠানের গর্বিত ফসল।
আপনি যদি এইসব তথ্য মাথায় রাখেন, তবে বুঝবেন প্রাচীন বিশ্বের এই সভ্যতাগুলোতেও গ্রিস ও রোমের মতো মন্দির ছিল শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার মূল উৎস। আগেই বলেছি, মন্দিরগুলোর এই ভূমিকা পরবর্তীকালের আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করে দেয়।
কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, বর্তমানে আমাদের দেশে এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলিতে জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চার পরিবর্তে বহুদিন ধরে অন্ধত্বের চাষ করা হচ্ছে। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, হরিমন্দিরগুলোতে যেন অন্ধত্বের চাষ করা না হয়। আলোর শিখা জ্বালানোই হোক হরিমন্দির প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য। হরিমন্দিরগুলো হয়ে উঠুক এক একটি আধুনিক শিক্ষালয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রাচীন যুগ থেকেই এই মন্দির মসজিদগুলো মানুষকে আহরনিশি মনে করিয়ে দিত, সৃষ্টিকর্তার তৈরি বিধি-বিধানগুলো নিয়ে গবেষণা করার কথা, অন্ধভাবে বিশ্বাস নয়, যৌক্তিক কারণ খুঁজে বের করার কথা। গুরুচাঁদ ঠাকুরের কথায় রয়েছে তাঁর স্পষ্ট বিধান—
দেবতা-মন্দির সবে গড়’ ঘরে ঘরে।নিত্য পূজা করো সেথা সরল অন্তরে।।এইখানে আমি বলি এক সমাচারদেবতা মন্দিরে পূজা করিবে কাহার?বিশ্বভরে এই নীতি দেখি পরস্পর।যে যা’রে উদ্ধার করে সে তার ঈশ্বর।।
— গুরুচাঁদ চরিত, ৫২৯ পাতা
এখন নিজের কাছে প্রশ্ন করুন, কোন সে ঈশ্বর, যা বিশ্বভরে (পৃথিবীজুড়ে) তাঁর নীতি কার্যকর রয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী মানুষকে উদ্ধার করছে; মানুষের দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা, অভাব, অভিযোগ থেকে মুক্তি দিয়েছে? তার নাম শিক্ষা। আরও স্পষ্ট করে বললে তা হল আধুনিক ও যুক্তিবিজ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষানীতি, যেখানে ইতিহাস (সমাজ বিজ্ঞান), ভূগোল (ভূবিজ্ঞান), ভৌত বিজ্ঞান, জীবন বিজ্ঞান, শিক্ষা বিজ্ঞান, আধুনিক গণিত, সাহিত্য ইত্যাদি পাঠের সুযোগ থাকবে। এগুলোর ভিতরে প্রবেশ করতে পারলেই সেই ঈশ্বরকে খুঁজে পাওয়া যাবে, যাকে ঘরে ঘরে প্রতিষ্ঠা করার কথা বলেছেন শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ও গরুচাঁদ ঠাকুর। তাহলে তাঁর পূজা করার জন্য কোন্ মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে হবে? উত্তর হল হরিমন্দির যেখানে বসলেই মনে পড়বে তার অমোঘ বাণী —
বিদ্যা ছাড়া এ জাতির দুঃখ নাহি যাবে।গ্রামে গ্রামে পাঠশালা করো তাই সবে।।
আসলে এক একটি আধুনিক শিক্ষালয়। একজন মানুষ যদি প্রকৃত শিক্ষিত হয়ে উঠতে পারেন, তবে তিনি স্পষ্ট দেখতে পাবেন, সমস্ত সম্পদের উৎপাদনকারী হওয়া সত্ত্বেও একজন নিম্নবর্গের মানুষ কেন তার ন্যায্য অধিকার বুঝে পান না। তিনি বুঝতে পারবেন, কারা কীভাবে কাজ করছে তাদের এই অধিকারহীনতার নেপথ্যে। বুঝতে পারবেন, কীভাবে এই অধিকার অর্জন করা সম্ভব। বলা ভালো, আদায় করা সম্ভব।
সবাই ভালো থাকুন, আনন্দে থাকুন, মানুষের পক্ষে থাকুন। শুভ সন্ধ্যা।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন