সরকারি অনুদান ও গরিব মানুষের কর্তব্য :
সরকারি অনুদান পাওয়া গরীব ও নিম্নবিত্ত মানুষের হক। কিন্তু তা কখনও দূর্নীতি ও সজনপোষণে স্বীকৃতি দেওয়ার বিনিময়ে নয়।
হক কেন?
সম্পদের আসল মালিক :
হক এই কারণে, পৃথিবীর সমস্ত সম্পদের প্রকৃত মালিক হচ্ছেন খেটে খাওয়া মানুষ। কারণ, তাদের মেধা ও শ্রমের বিনিময়েই পৃথিবীতে প্রথম সম্পদের জন্ম হয়েছে। এখনও সেভাবেই হয়। একদলা মাটি থেকে ইট তৈরি হওয়া, তা দিয়ে মামুলি বাড়ি কিংবা প্রাসাদের মত পার্লামেন্ট ভবন, কিংবা মোটা চালের ভাত থেকে সরু বাসমতি চালের উৎপাদন, এক কথায় মানুষের বেঁচে থাকার, ভালো থাকার সমস্ত উপকরণ তৈরিতে যার শ্রম ও মেধার কোন বিকল্প নেই তিনি হচ্ছেন এই শ্রমজীবী মানুষ।
অথচ সম্পদের স্রষ্টা যারা, তারাই কখনও বিনা চিকিৎসায় মরেন, কখনও না খেয়ে মরেন অথবা আধপেটা খেয়ে বা অখাদ্য কুখাদ্য খেয়ে ধুকে ধুকে মরেন। এর থেকে মুক্তি পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।
আর এটা যে করা যাচ্ছে, তার কারণ হচ্ছে আমাদের অজ্ঞতা, এবং প্রচলিত রাষ্ট্র ব্যবস্থার আড়ালে লুকিয়ে রাখা কৌশলী শোষণ নীতি, যার স্তম্ভ হল বিশ্বব্যাপী প্রচলিত মুদ্রা ব্যবস্থা নামক ফেক বিনিময় ব্যবস্থা। এর মাধ্যমেই এবং বলা ভালো, তারই কারণে সম্পদের আসল মালিকরা কখনও মালিকানা পান না।।
আরও পড়ুন : পূঁজির আসল মালিক কে?
কীভাবে মালিকানা হারালেন?
১) মুদ্রা ব্যবস্থার প্রবর্তন :
বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে প্রথমে এক প্রকার সম্পদের বিনিময়ে অন্য এক প্রকার সম্পদ দেওয়া-নেওয়া হত। এটাই ছিল লক্ষ লক্ষ বছরের বিনিময় ব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যম। চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙা ভরে সম্পদ নিয়ে বানিজ্যে যাওয়া আর বিদেশ থেকে জাহাজ ভরে পন্য আনার কাহিনী আমরা মনসামঙ্গল কাব্যে পড়েছি।
এর পর এলো ধাতুকে সম্পদ বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার নীতি। এক্ষেত্রে সোনাকে মূল্যবান করা হল। কেন করা হল? সোনা কি রুটি-কাপড়া-মকান -এর মত কোন এসেনশিয়াল কমোডিটি, যা না থাকলে মানুষ বাঁচতে পারেন না? গজনীর সুলতান মাহমুদ, ১৭ বার সোমনাথ মন্দির আক্রমণ করেছিলেন সোনা-জহরত লুট করার জন্য! কেন করেছিলেন? খাবেন বলে? তিনি না খেয়ে মারা যাচ্ছেন বলে? না। সোনাকে মূল্যবান বলে গণ্য করা হয়েছিল বলে, তাকে বিনিময়ের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল বলে। কোষাগারে এই সোনা থাকা মানে, একসঙ্গে অনেক কিছুর ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকার গ্যারান্টি সৃষ্টি হওয়া। প্রশ্ন হল, সোনাকে এভাবে মূল্যবান করা হলো কেন? প্রথম কারণ হল এর দুষ্প্রাপ্যতা, দ্বিতীয় কারণ এর উজ্জ্বল্য, এবং তৃতীয় হল এর দীর্ঘস্থায়িত্ব, অর্থাৎ সহজে নষ্ট হয় না। এখানেই খুলে যায় লুটের রাস্তা। এই বৈশিষ্ট্যের কথা মাথায় রেখেই একে মূল্যবান মাধ্যম করা হল অন্য যে কারণে, তা হল একে সহজেই লুট করা সম্ভব হবে, জমা করা সম্ভব হবে এবং এই একটি মাত্র জিনিসের মজূত বাড়াতে পারার অর্থ হল পৃথিবীর সবকিছুকে নিজের কব্জায় এনে ফেলা যাবে। এক কথায়, অনেক কিছুকে এক লপ্তে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। যেকোনো উপায়ে একে নিজের কব্জায় নিতে পারলেই সব কিছুর উপর বৈধ নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা যাবে। আজ যে কারণে মার্কিন ডলারের আধিপত্য তৈরি হয়েছে, তা হল বৈধ এবং অবৈধ উপায়ে কব্জা করা তাদের এই বিপুল পরিমাণ সোনার মজুত। সচেতন মানুষ মাত্রেই জানেন, এখন মার্কিন ডলার যার কাছে, দুনিয়ার নিয়ন্ত্রণও অনেকটাই তার কাছে।
মূলত একারনেই সোমনাথ মন্দির আক্রমণ করার আগে সুলতান মাহমুদ বুঝেছিলেন, সোনা যার, দুনিয়ার উপর নিয়ন্ত্রণও তার। সুতরাং সোনা যেখানে, আক্রমণ সেখানেই করতে হবে। তাই একবার নয়, সতের বার, তাই অন্য কোনো জায়গায় নয়, সোমনাথেই। এবং তাও আবার ২৫০০ কিলোমিটার ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ পথ অতিক্রম করে আসা এবং ফিরে যাওয়া। কারণ তৎকালীন ভারতের মধ্যে সর্বোচ্চ সোনার মজুত ছিল এই মন্দিরে। মন্দির ভাঙাই যদি তাঁর মূল লক্ষ্য হত, তাহলে তালিবানদের ভাঙার জন্য আফগানিস্তানের কোন বৌদ্ধ মন্দির ও বৌদ্ধ মূর্তি এতো বছর পড়ে থাকার কথা না।
এভাবেই পৃথিবীতে সূচনা হয়েছিল দুর্নীতির, সম্পদ লুট করার অভিযান। সম্পদ জমা করার ইচ্ছা এবং শক্তি তৈরি হল ক্ষমতার কেন্দ্র বিন্দুতে থাকা কিছু মানুষের মধ্যে। সোনা জমা করা অপেক্ষাকৃত সহজ।
এর পর এলো তামা, ব্রোঞ্জ সহ অপেক্ষাকৃত কম দামি ও সহজপ্রাপ্য ধাতুকে মুদ্রা করার চেষ্টা। দেশের ভরে গেলো জাল নোটে। মহম্মদ বিন তুঘলক দুর্নীতি আটকাতে তামার নোট তুলে নিলেন। আমরা তাঁকে পাগলা রাজা বললাম। তার এতো বছর
সোনার পরিবর্তে কাগজের মুদ্রা তৈরি হল। জমা এবং গোপন করা আরও সহজ হয়ে গেলো। একটন সোনা লোকানো যত সহজ, সমমূল্যের কাগজের নোট লুকানো এবং জামানো ততটাই সহজ। তৈরি করা তো আরও সহজ। তাই আগে সোনা কাড়ার লড়াই হত। এখন এই সোনা বিকল্প কাগজের মুদ্রায় রূপান্তরিত হয়েছে, যা দূর্নীতিকে, লুন্ঠনকে আরও সহজ করে দিয়েছে।
২) মুদ্রা ব্যবস্থার বিবর্তন :
এইভাবে কাগজের মুদ্রা তৈরি ও তার নিয়ন্ত্রণ মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে চলে যাওয়ার কারণে মানুষের শ্রম ও মেধা মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। কাগজের টাকাই এখন ‘প্রকৃত সম্পদে’ রূপান্তর করা হয়েছে। এই টাকা সহজেই জমা করা যায়, গোপন করা যায়। এই বিনিময় ব্যবস্থাই জন্ম দিয়েছে সম্পদের অধিকার এবং বন্টনে গুরুতর অসাম্য। পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছে, ধনী ও দরিদ্র শ্রেণির, শোষক ও শোষিতের, বঞ্চনাকারী ও বঞ্চিতের।
এই বিনিময় ব্যবস্থা ডিজিটাইজ হলে তা আরও ভয়ঙ্কর চেহারা নেবে। কারণ, সব অর্থই (টাকা) সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে। প্রকৃত সম্পদ টাকা (রূপি) নামক ফেক ডিজিটাল মুদ্রার কব্জায় চলে যাবে, যার নিয়ন্ত্রণ আর আপনার হাতে এখনও যেটুকু আছে, তা আর থাকবে না।
রাষ্ট্র নামক একটি যন্ত্র এবং তার নিয়ন্ত্রণকারীরা ইতিমধ্যেই আপনার বাড়িতে ক্যাশ টাকা রাখার সীমা বেঁধে দিয়েছেন। অর্থাৎ আপনার সম্পদ আপনি কোথায় রাখবেন তা আপনি ঠিক করার অধিকারী নন। আবার যেখানে রাখবেন, রাষ্ট্র নির্ধারিত সংস্থায়, তার গ্যারান্টিও তারা দেবে না। ফলে একটু একটু করে রাষ্ট্রের যাঁতাকলে আটকে পড়ছেন আপনি, আমি, আমরা সব্বাই। ডিজিটাইজ করা গেলে ষোল কলা পূর্ণ হবে। এখনও যেটুকু সম্পদ নিজের কাছে রাখতে পারছেন, তাও আর পারবেন না। কারণ ডিজিটাল রুপি তো আর বাক্সে রাখার জিনিস নয়। ওটা ডিজিটাল লকারে রাখতে হয়, যার আসল চাবি আপনার কাছে থাকে না, কাগজের টাকা বা সোনার মুদ্রার মত।
এই ফেক মুদ্রা ব্যবস্থা বা বিনিময় ব্যবস্থার কারণেই দূর্নীতি করা আরও সহজ হয়ে গেছে। কেন? আপনি কোনও প্রাকৃতিক সম্পদ প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমা করতে পারবেন না। কারণ, তা জমা করা যায় না লাগামহীন ভাবে। রাখবেন কোথায়? গোপন করবেন কীভাবে? কাগজের মুদ্রার মাধ্যমে আপনি জমাকৃত সম্পদের পরিমাণ আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারেন। যেহেতু কাগজের গায়ে লিখে দিলেই তা দশ টাকা থেকে দশ হাজার মূল্যমানে পৌঁছে দেওয়া যায়। একারনেই একজন দশ কোটি টাকা সহজেই লুকিয়ে ফেলতে পারেন, দুর্নীতি করে গ্রহণ করতে পারেন, সহজে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাচার করেও দিতে পারেন। কিন্তু প্রাকৃতিক সম্পদ আকারে বৃহৎ হাওয়ায় তা এত সহজে জমা এবং গোপন করা সম্ভব হয় না। আমাদের সামনে যে বৈষয়িক সম্পদ আমরা দেখি, সেগুলোকে আপনি গোপন করতে পারবেন না। আপনার যা কিছু থাকবে তা সবার জন্য দৃশ্যমান। বাড়ি, গাড়ি, আসবাবপত্র সহ যা আপনার জীবন ধারণের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সেইসব সম্পদ গোপন করা যায় না। কিন্তু গোপন করা যায়, কাগজের টাকা। এই টাকা বা মুদ্রাকে ডিজিটাইজ করতে পারলে এই গোপন করার সুবিধে আমজনতার কাছে একদমই থাকবে না। কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী তা সহজেই গোপন করতে পারবেন, বাড়াতে পারবেন এবং এগুলো দিয়েই সমস্ত পার্থিব সম্পদ নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবেন। কারণ এই ডিজিটাল প্রযুক্তি নির্ভর ডিজিটাল মুদ্রার কোন নিয়ন্ত্রণ আপনার সাধ্যের মধ্যে থাকবে না। এই নেটওয়ার্ক বিশ্ব জুড়ে বিস্তৃত, তা হাতে গোনা কয়েকজন পুঁজি ও প্রযুক্তি জায়ান্টদের নিয়ন্ত্রণে।
তাহলে উপায় কী?
এখন কি তাহলে এই মুদ্রা ব্যবস্থা বাতিল করে দিতে হবে? না। এটা অসম্ভব। প্রযুক্তির উন্নতি আটকানো যায় না। পরিবর্তনশীলতাই মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তাই এই ব্যবস্থাকে আপনি অস্বীকার করতে পারবেন না, আটকাতেও পারবেন না। তাহলে উপায়?
কেন দুর্নীতির স্বীকৃতির বিনিময়ে নয় :
এখানেই আপনার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যে অনুদান পান, তার আসলে আপনার কাছ থেকে ‘আইনসিদ্ধ চৌর্যবৃত্তির’ মাধ্যমে লুট করা সম্পদের অতি ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র একটি অংশ। কারণ, সম্পদ সৃষ্টির একমাত্র ক্ষমতাধর মানুষ হচ্ছেন শ্রমজীবী মানুষ। আপনি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত একজন ‘নাগরিক’, আদতে একজন ‘আধুনিক দাস’। কারণ সবই আপনি তৈরি করেন, অথচ কিছুই আপনার নয়।
এখন আপনার বৈধ অধিকারের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ আপনাকে দেওয়ার বিনিময়ে, যারা আপনার তৈরি সম্পদকে দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করছে, তাদের দূর্নীতিকে উপেক্ষা করেন, তাহলে আপনার আধুনিক দাসত্ব ঘুচবে না, বরং তা ক্রমশঃ আদিম চেহারায় ফিরে যাবে। কারণ, আপনি আল্লাহ কিম্বা ভগবানের ভরসায় নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকলেও আপনার তৈরি সম্পদ আত্মসাৎ করা উদ্দেশ্য যাদের, তারা কিন্তু জোট বেঁধে আছেন এবং সদা সর্বদা জেগে আছেন।
সুতরাং আপনার দাসত্ব কাটাতে হলে, ভাগ্য ফেরাতে হলে আপনাকেই পাহারাদারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। আপনাকেই হতে হবে দুর্নীতির পাহারাদার, ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে পাহারাদার। আপনার তৈরি সম্পদকে যাঁরা নিজেদের জন্য, আরও কুক্ষিগত করার জন্য, বিপদজনক শ্রম আইন আনছে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমিয়ে আপনাকে অন্ধ ও অশক্ত রাখার নীতি নিচ্ছেন, তার বিরুদ্ধে আপনার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে হবে। তার আগে বুঝে নিতে হবে কারা তাঁরা, যাঁরা আপনার জন্য সত্যিকার অর্থে লড়াই করছে। আর এই চেনার জন্য দরকার প্রথমে স্কুল কলেজে লেখাপড়া করা এবং শেষে জগৎ ও জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা শুরু করা। তবেই আপনি আসল সত্যিটা বুঝতে পারবেন। বুঝতে পারলে, সম্পদের উপর আপনার অধিকার ফিরে পাওয়ার রাস্তা খুঁজে পাবেন।
----------xx-----------
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন