সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

সরকারি অনুদান ও গরিব মানুষের কর্তব্য

সরকারি অনুদান ও গরিব মানুষের কর্তব্য :

সরকারি অনুদান পাওয়া গরীব ও নিম্নবিত্ত মানুষের হক। কিন্তু তা কখনও দূর্নীতি ও সজনপোষণে স্বীকৃতি দেওয়ার বিনিময়ে নয়।

হক কেন?

সম্পদের আসল মালিক :

হক কেন বলছি? বলছি এই কারণে যে, প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীর সমস্ত সম্পদের প্রকৃত মালিক হচ্ছেন খেটে খাওয়া মানুষ। কারণ, তাদের মেধা ও শ্রমের বিনিময়েই পৃথিবীতে প্রথম সম্পদের জন্ম হয়েছে। এখনও সেভাবেই হয়। একদলা মাটি থেকে ইট তৈরি হওয়া, তা দিয়ে মামুলি কোন বাড়ি কিংবা প্রাসাদের মত পার্লামেন্ট ভবন, কিংবা মোটা চালের ভাত থেকে সরু বাসমতি চালের উৎপাদন—এক কথায় মানুষের বেঁচে থাকার, ভালো থাকার সমস্ত উপকরণ তৈরিতে যার শ্রম ও মেধার কোন বিকল্প নেই, তিনি হচ্ছেন এই শ্রমজীবী মানুষ।

অথচ এই সম্পদের স্রষ্টা যারা, তারাই কখনও বিনা চিকিৎসায় মরেন, কখনও না খেয়ে মরেন। কখনও আবার আধপেটা খেয়ে অথবা অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে ধুকে ধুকে মরেন। এর থেকে মুক্তি পাওয়া দিন দিন অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠছে।

আর এই অবস্থা যে সৃষ্টি করা যাচ্ছে, তার কারণ হল—
  • ১) এই শ্রমজীবী মানুষের অজ্ঞতা।
  • ২) প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থার আড়ালে লুকিয়ে রাখা কৌশলী শোষণ নীতি।
  • ৩) এই নীতিকে কার্যকর করার জন্য তৈরি তথাকথিত বিনিময় ব্যবস্থা, যার স্তম্ভ হল বিশ্বব্যাপী প্রচলিত মুদ্রা ব্যবস্থা।

মূলত এই তথাকথিত মুদ্রাব্যবস্থার মাধ্যমেই এবং বলা ভালো, তারই কারণে সম্পদের আসল মালিকরা কখনও প্রকৃত মালিকের হাতে থাকে না।

আরও পড়ুন : পূঁজির আসল মালিক কে?

কীভাবে মালিকানা হারালেন?

১) মুদ্রা ব্যবস্থার প্রবর্তন : 

বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে সভ্যতার সূচনায় যে বিনিময় ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল তা হল —এক প্রকার সম্পদের বিনিময়ে অন্য প্রকার সম্পদের সরাসরি দেওয়া-নেওয়া। ধানের বদলে গম, কিংবা গমের বদলে তেল কিংবা অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য। এটাই ছিল লক্ষ লক্ষ বছরের বিনিময় ব্যবস্থা, যা বিভিন্ন ফর্মে ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যম হিসেবেও থেকেছে যুগ যুগ ধরে। চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙায় সম্পদ নিয়ে বানিজ্যে যাওয়া, আর বিদেশ থেকে জাহাজ ভরে পন্য আনার কাহিনী আমরা মনসামঙ্গল কাব্যেও পড়েছি।

এর পর এলো ধাতুকে সম্পদ বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার রীতি ও নীতি। এক্ষেত্রে সোনাকে মূল্যবান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হল। কেন দেওয়া হল? সোনা কি খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের মত কোন অপরিহার্য সামগ্রী, যা না থাকলে মানুষ বাঁচতে পারে না? গজনীর সুলতান মাহমুদ, ১৭ বার সোমনাথ মন্দির আক্রমণ করেছিলেন কী উদ্দেশ্যে? সোনা-জহরত লুট করার জন্য! কেন করেছিলেন, খাবেন বলে? তিনি না খেতে পেয়ে মারা যাচ্ছিলেন বলে? না। তার কারণ—
  • ১) সেযুগে সোনাকে মূল্যবান ধাতু বলে গণ্য করা হতো বলে।
  • ২) তাকে বিনিময়ের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল বলে। এবং 
  • ৩) কোষাগারে এই সোনা থাকা মানে, একসঙ্গে অনেক কিছুর ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকার গ্যারান্টি সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ আছে বলে।
প্রশ্ন হল, সোনাকে এভাবে মূল্যবান করা হলো কেন? প্রথম কারণ হল এর দুষ্প্রাপ্যতা, দ্বিতীয় কারণ এর উজ্জ্বল্য, এবং তৃতীয় হল এর দীর্ঘস্থায়িত্ব, অর্থাৎ সহজে সোনা নষ্ট হয় না। এখানেই খুলে যায় লুটের রাস্তা। সোনার এই বৈশিষ্ট্যের কথা মাথায় রেখেই বণিক ও বণিকগোষ্ঠী-নিয়ন্ত্রিত শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা সোনা মূল্যবান মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি পেল। অন্য যে কারণে মূল্যবান হল, একে সহজেই লুট করা সম্ভব হবে, জমা করা সম্ভব হবে এবং এই একটি মাত্র জিনিসের মজূত বাড়াতে পারার অর্থ হল পৃথিবীর সবকিছুকে নিজের কব্জায় এনে ফেলা যাবে। এক কথায়, অনেক কিছুকে এক লপ্তে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। যেকোনো উপায়ে একে নিজের কব্জায় নিতে পারলেই সব কিছুর উপর বৈধ নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা যাবে। আজ এই সোনার মজুতের আধিক্যের কারণেই মার্কিন ডলারের একাধিপত্য তৈরি হয়েছে। চিন একারণেই সোনার মজুতকে সর্বোচ্চ মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এবং অনেকটা সফলও হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র কখনো বৈধ এবং কখনো অবৈধ উপায়ে কব্জা করে এই বিপুল পরিমাণ সোনার মজুত তৈরি করেছে। সচেতন মানুষ মাত্রেই জানেন, এখন মার্কিন ডলার যার কাছে, দুনিয়ার নিয়ন্ত্রণও অনেকটাই তার কাছে।

বিশ্বে সোনা মজুতের খতিয়ান (মার্চ ২০২৬)

  1. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র : ৮১৩৩ টন  । প্রথম স্থান
  2. জার্মানি            : ৩৩৫১ টন  । দ্বিতীয় স্থান
  3. ইতালি              : ২৪৫২ টন  । তৃতীয় স্থান
  4. ফ্রান্স                : ২৪৩৭ টন  । চতুর্থ স্থান
  5. রাশিয়া              : ২৩৩০ টন । পঞ্চম স্থান
  6. চীন                   : ২৩০৯ টন । ষষ্ঠ স্থান
  7. ভারত                : ৮৮০ টন   । সপ্তম স্থান
  8. জাপান              : ৮৪৬ টন   । অষ্টম স্থান

একটি মজার তথ্য : 

সরকারি মজুতের দিক থেকে হিসাব করলে ভারত বিশ্বে সপ্তম স্থানের অধিকারী। কিন্তু ভারতীয় পরিবারগুলোর কাছে জমে থাকা ব্যক্তিগত স্বর্ণের পরিমাণ হিসাব করলে বিশ্বে ভারতের স্থান প্রথম।
অনুমান করা হয়, ভারতীয় সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টন স্বর্ণ মজুত রয়েছে।

তথ্যসূত্র : ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল, পিপলস ব্যাঙ্ক অফ চায়না, রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া, ট্রেডিং ইকোনোমিক্স।

মূলত এই ধরণের রীতি ও নীতির কারনেই সোমনাথ মন্দির আক্রমণ করার আগে সুলতান মাহমুদ বুঝেছিলেন, সোনা যার, দুনিয়ার উপর নিয়ন্ত্রণও তার। সুতরাং সোনা যেখানে, আক্রমণ সেখানেই করতে হবে। তাই একবার নয়, সতের বার। তাই অন্য কোনো জায়গায় নয়, সোমনাথেই। এবং তাও আবার ২৫০০ কিলোমিটার ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ পথ অতিক্রম করে আসা এবং ফিরে যাওয়া। কারণ তৎকালীন ভারতের মধ্যে সর্বোচ্চ সোনার মজুত ছিল এই মন্দিরে। মন্দির ভাঙাই যদি তাঁর মূল লক্ষ্য হত, তাহলে তালিবানদের ভাঙার জন্য আফগানিস্তানের কোন বৌদ্ধ মন্দির ও বৌদ্ধ মূর্তি এতো বছর পড়ে থাকার কথা না। সুলতান মাহমুদের ছেলে তার বিজয়ী এলাকার মসজিদ ভাঙতেন না।

এভাবেই পৃথিবীতে সূচনা হয়েছিল দুর্নীতির, সম্পদ লুট করার অভিযান। সম্পদ জমা করার ইচ্ছা ও শক্তি তৈরি হল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা কিছু মানুষের মধ্যে। যেহেতু তৎকালীন সময়ে সোনা জমা করা অপেক্ষাকৃত সহজ। 

এর পর এলো তামা, ব্রোঞ্জ-সহ অপেক্ষাকৃত কম দামি ও সহজপ্রাপ্য ধাতুকে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা। কিন্তু দেশে ভরে গেলো জাল নোট। আমাদের দেশে মহম্মদ বিন তুঘলক দুর্নীতি আটকাতে তামার নোট তুলে নিলেন। আমরা তাঁকে ‘পাগলা রাজা’ বললাম। অথচ তাঁর এতো বছর আমরা, পৃথিবীর মানুষ, কমদামি ধাতু নয়, পুনরায় সোনার পরিবর্তে কাগজের মুদ্রা তৈরি করলাম! সহজলভ্য হিসেবে অনেক বেশি সম্ভাবনাকে কোন আমলই দেওয়া হলো না। 

আবারও প্রশ্ন। কেন? জমা এবং গোপন করা আরও সহজ হবে বলে! একটন সোনা লোকানো যত সহজ, সমমূল্যের কাগজের নোট লুকানো এবং জামানো তার চেয়েও বেশি সহজ। তৈরি করা তো আরও সহজ। তাই আগে সোনা কাড়ার লড়াই হত। এখন এই সোনার বিকল্প কাগজের মুদ্রা (পড়ুন ডলার) কেড়ে নেওয়া ও জমা করার লড়াই শুরু হয়ে গেল। যা দূর্নীতিকে, লুন্ঠনকে বৈশ্বিক চেহারা দিলো এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে তাকে আরও সহজ করে দিলো। এভাবে দেশীয়ভাবে দেখলে, দেশে পুঁজিপতি শ্রেণির জন্ম হয়েছে এবং বৈশ্বিকভাবে দেখলে, আমেরিকাকে পৃথিবীর ডন হতে সাহায্য করেছে।

২) মুদ্রা ব্যবস্থার বিবর্তন :

এইভাবে কাগজের মুদ্রা তৈরি ও তার নিয়ন্ত্রণ মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে চলে যাওয়ার কারণে মানুষের শ্রম ও মেধা মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। কাগজের টাকাই এখন ‘প্রকৃত সম্পদে’ রূপান্তর করা হয়েছে। এই টাকা সহজেই জমা করা যায়, গোপন করা যায়। এই বিনিময় ব্যবস্থাই জন্ম দিয়েছে সম্পদের অধিকার এবং বন্টনে গুরুতর অসাম্য। পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছে, ধনী ও দরিদ্র শ্রেণির, শোষক ও শোষিতের, বঞ্চনাকারী ও বঞ্চিতের। আদিম বিনিময় ব্যবস্থা থাকলে তা কখনোই সম্ভব হতো না।

  • আরও পড়ুন : আধুনিক বিশ্বে চিকিৎসা ব্যবস্থাও একই রকম ভাবে কর্পোরেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। কীভাবে? পড়ুন এখানে।

এই বিনিময় ব্যবস্থা ডিজিটাইজ হলে তা আরও ভয়ঙ্কর চেহারা নেবে। কারণ, সব অর্থই (টাকা) সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে। প্রকৃত সম্পদ টাকা (রূপি) নামক ‘ফেক’ ডিজিটাল মুদ্রার কব্জায় চলে যাবে, যার নিয়ন্ত্রণ আর আপনার হাতে এখনও যেটুকু আছে, তা আর থাকবে না।

রাষ্ট্র নামক একটি যন্ত্র এবং তার নিয়ন্ত্রণকারীরা ইতিমধ্যেই আপনার বাড়িতে ক্যাশ টাকা রাখার সীমা বেঁধে দিয়েছেন। অর্থাৎ আপনার সম্পদ আপনি কোথায় রাখবেন তা আপনি ঠিক করার অধিকারী নন। আবার যেখানে রাখবেন, রাষ্ট্র নির্ধারিত সংস্থা কিম্বা বেসরকারি ব্যাঙ্কে, তার গ্যারান্টিও তারা দেবে না। ফলে একটু একটু করে রাষ্ট্রের যাঁতাকলে আটকে পড়ছেন আপনি, আমি, আমরা সব্বাই। ডিজিটাইজ করা গেলে ষোল কলা পূর্ণ হবে। এখনও যেটুকু সম্পদ নিজের কাছে রাখতে পারছেন, তাও আর পারবেন না। কারণ ‘ডিজিটাল রুপি’ তো আর বাক্সে রাখার জিনিস নয়। ওটা ডিজিটাল লকারে রাখতে হয়, যার আসল চাবি আপনার কাছে থাকে না, কাগজের টাকা বা স্বর্ণমুদ্রার মত।

এই ‘ফেক’ মুদ্রা ব্যবস্থা বা বিনিময় ব্যবস্থার কারণেই দূর্নীতি করা আরও সহজ হয়ে গেছে এবং আগামীদিনে সহজ হয়ে যা মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের কাছে। কেন? 

আপনি কোনও প্রাকৃতিক সম্পদ প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমা করতে পারেন না। কারণ, তা জমা করা যায় না লাগামহীন ভাবে। রাখবেন কোথায়? গোপন করবেন কীভাবে? নষ্ট হয়ে যাওয়া রুখবেন কী করে। কিন্তু কাগজের মুদ্রার মাধ্যমে আপনি জমাকৃত সম্পদের পরিমাণ আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারেন। যেহেতু কাগজের গায়ে লিখে দিলেই তা দশ টাকা থেকে দশ হাজার মূল্যমানে পৌঁছে দেওয়া যায়। একারনেই একজন দশ কোটি টাকা সহজেই লুকিয়ে ফেলতে পারেন, দুর্নীতি করে গ্রহণ করতে পারেন, সহজে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাচার করেও দিতে পারেন। কিন্তু ‘প্রাকৃতিক সম্পদ’ আকারে বৃহৎ হাওয়ায় তা এত সহজে জমা এবং গোপন করা সম্ভব হয় না। আমাদের সামনে যে বৈষয়িক সম্পদ আমরা দেখি, সেগুলোকে আপনি গোপন করতে পারবেন না। আপনার যা কিছু থাকবে তা সবার জন্য দৃশ্যমান। বাড়ি, গাড়ি, আসবাবপত্র সহ যা আপনার জীবন ধারণের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সেইসব সম্পদ গোপন করা যায় না। কিন্তু গোপন করা যায় কাগজের টাকা। এই টাকা বা মুদ্রাকে ডিজিটাইজ করতে পারলে এই গোপন করার সুবিধে আমজনতার কাছে একদমই থাকবে না। কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী তা সহজেই গোপন করতে পারবেন, বাড়াতে পারবেন এবং এগুলো দিয়েই সমস্ত পার্থিব সম্পদ নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবেন। কারণ এই ডিজিটাল প্রযুক্তি নির্ভর ডিজিটাল মুদ্রার কোন নিয়ন্ত্রণ করার সামর্থ্য আপনার সাধ্যের মধ্যে থাকবে না। এই নেটওয়ার্ক বিশ্ব জুড়ে বিস্তৃত, তা বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকজন পুঁজি ও প্রযুক্তি জায়ান্টদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং থাকবে।

তাহলে উপায় কী?

এখন কি তাহলে এই মুদ্রা ব্যবস্থা বাতিল করে দিতে হবে? না। এটা অসম্ভব। প্রযুক্তির উন্নতি আটকানো যায় না। পরিবর্তনশীলতাই মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তাই এই ব্যবস্থাকে আপনি অস্বীকার করতে পারবেন না, আটকাতেও পারবেন না। তাহলে আমাদের কর্তব্য?

কেন দুর্নীতির স্বীকৃতির বিনিময়ে নয় :

এখানেই আপনার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যে অনুদান পান, তা আসলে আপনার কাছ থেকে ‘আইনসিদ্ধ চৌর্যবৃত্তির’ মাধ্যমে লুট করা সম্পদের অতি ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র একটি অংশ। কারণ, সম্পদ সৃষ্টির একমাত্র ক্ষমতাধর মানুষ হচ্ছেন আপনি, একজন শ্রমজীবী মানুষ। আপনি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত একজন ‘নাগরিক’, আদতে এখন একজন ‘আধুনিক দাস’-এ পরিণত হয়েছেন। কারণ, সবই আপনি তৈরি করেন, অথচ কিছুই আপনার নিয়ন্ত্রণে নেই।

এখন আপনার বৈধ অধিকারের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ আপনাকে দেওয়ার বিনিময়ে, যদি যারা আপনার তৈরি সম্পদকে দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করছে, তাদের দূর্নীতিকে উপেক্ষা করেন, তাহলে আপনার ‘আধুনিক দাসত্ব’ ঘুচবে না, বরং তা ক্রমশঃ আরও আদিম চেহারায় ফিরে যাবে। কারণ, আপনি আল্লাহ কিম্বা ভগবানের ভরসায় নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকলেও আপনার তৈরি সম্পদ আত্মসাৎ করা উদ্দেশ্য রয়েছে যাদের, তারা কিন্তু জোট বেঁধে আছেন এবং সদা সর্বদা জেগে আছেন।

সুতরাং আপনার দাসত্ব কাটাতে হলে, ভাগ্য ফেরাতে হলে আপনাকেও জোট বাঁধতে হবে, জেগে থাকতে হবে এবং পাহারাদারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। আপনাকেই হতে হবে দুর্নীতির পাহারাদার, ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে পাহারাদার। আপনার শ্রম ও মেধায় তৈরি সম্পদকে যাঁরা আরও কুক্ষিগত করার জন্য বিপদজনক শ্রম আইন আনছে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমিয়ে আপনাকে অন্ধ ও অশক্ত রাখার নীতি নিচ্ছেন, তার বিরুদ্ধে আপনার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে হবে। তার আগে বুঝে নিতে হবে, কারা তাঁরা, যাঁরা আপনার জন্য সত্যিকার অর্থে লড়াই করছে। আর এই চেনার জন্য দরকার প্রথমে স্কুল কলেজে লেখাপড়া করা এবং শেষে জগৎ ও জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা শুরু করা। তবেই আপনি আসল সত্যিটা বুঝতে পারবেন। বুঝতে পারলে, সম্পদের উপর আপনার অধিকার ফিরে পাওয়ার রাস্তাও খুঁজে পাবেন। যা তারা দিচ্ছে, তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি আপনার পাওনা। এবং যা তারা নিচ্ছে, তার সে কি ভাবো তাদের পাওনা নয়।

তাই নিজে পড়াশোনা করুন, নিজ সন্তানকে কষ্ট করে হলেও পড়াশোনায় উৎসাহিত করুন এবং ভোট দিতে বলা প্রার্থীর নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো দেখে নিন। যুক্তি বুদ্ধি ও তথ্য দিয়ে যাচাই করুন তারা যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে তা কি তারা মেনে চলেছে, যেখানে তারা ক্ষমতায় আছে?
----------xx-----------

মন্তব্যসমূহ

আলী হোসেনের বহুল-পঠিত উক্তিগুলো পড়ুন

ইতিহাস কী?

ইতিহাস কী? ইতিহাস হচ্ছে মানুষের তৃতীয় নয়ন। এই তৃতীয় নয়ন মানুষকে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ বিষয়ে সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে সাহায্য করে। এই পর্যবেক্ষণই জগত এবং জীবনের প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। একজন মানুষ, জগত ও জীবন সম্পর্কে  প্রকৃত সত্য যতটা উপলব্ধি করতে পারেন, তিনি ততটাই শিক্ষিত বলে বিবেচিত হন। তাই ইতিহাস জানা এবং বোঝা ছাড়া একজন মানুষ পূর্ণাঙ্গ শিক্ষিত হয়ে উঠতে পারেন না। ইতিহাস কেন তৃতীয় নয়ন? একটা উদাহরণ নেওয়া যাক। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কথা ধরুন। আমরা এই ঘটনাকে যখন প্রত্যক্ষ করি, তখন দেখি দুটি ভিন্ন ধর্মের মানুষ পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে সহিংস হয়ে উঠছে। আমরা খুব সহজেই এই ঘটনাকে ধর্মের সঙ্গে জুড়ে দিই এবং ধর্মকে এর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করি। ধর্মীয় বিদ্বেষের ফল হিসেবে সেগুলোকে ব্যাখ্যা করি। কিন্তু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ইতিহাসকে কার্যকারণ সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, এই দাঙ্গাগুলোর পিছনে ধর্মের চেয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য খুবই শক্তিশালী ভূমিকায় রয়েছে। অর্থাৎ মূলত, ...

ধর্মের নামে রাজনীতিই প্রমাণ করে আমরা মধ্যযুগীয়

ধর্মের নামে রাজনীতিই প্রমাণ করে আমরা মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষে এখনও যে ধর্মের নামে রাজনীতি হয় বা হচ্ছে, তাতেই প্রমাণ হয় আমরা আধুনিক নয়, চিন্তায়-চেতনায় এখনো মধ্যযুগে বাস করি। কারণ, আধুনিক যুগের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য আছে। কোন জাতি, নিজেকে আধুনিক বলে দাবি করতে চাইলে, এই বৈশিষ্ট্যগুলো তাদের মধ্যে থাকা প্রয়োজন। এর মধ্যে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো হল ধর্ম-মুক্ত রাজনীতি। পৃথিবীর যেখানে যেখানে রাজনীতি ধর্মমুক্ত হয়েছে, সেখানে সেখানে রাজনৈতিক হিংসা হানাহানি অনেক কমে গেছে। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা, যা আধুনিকতার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর দিকে তাকালেই বুঝতে পারা যায় ধর্মের সঙ্গে রাজনীতি সম্পর্কিত থাকলে কি ভয়ংকর রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়। বোঝা যায়, কীভাবে নিরবিচ্ছিন্ন অস্থিরতা ও রাজনৈতিক হিংসা এবং প্রতিহিংসার দাপটে একটা জাতি শতধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। মূলত এ কারণেই, অসংখ্য ছোট ছোট, বলা ভালো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়েছে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য। ফলে সাম্রাজ্যবাদী বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর নয়া সাম্রাজ্যবাদী নাগপাশ ...

ধর্ম দিয়ে ধর্মান্ধতা দূর করা যায় না।

ধর্ম দিয়ে ধর্মান্ধতা দূর করা যায় না প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম দিয়ে ধর্মান্ধতা দূর করা যায় না। কারণ দুটোরই ভিত্তি হচ্ছে যুক্তিবিমুখ বিশ্বাস। তাই, কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা হয়তো যায়। কিন্তু ধর্ম দিয়ে ধর্মান্ধতা দূর করা কখনই যায় না। একথা ভুলতে বসেছেন যাঁরা, তাঁরা নিজেদের প্রগতিশীল দাবি করতেই পারেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এতে প্রগতিশীলতা গতিলাভ করে না বরং গতি হারায়। --------x------- Di Ansar Ali হ্যা, পরিস্থিতি অনুযায়ী সমঝোতা করতে হয়। কিন্তু মাথায় রাখতে হয়, তাতে আমার সত্যিই কোনো লাভ হচ্ছে কিনা। এবং তার অদূর ও সুদূরপ্রসারী ফলাফল প্রগতিশীল চিন্তাচেতনার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করাটা মোটেই যুক্তিযুক্ত নয় বলেই মনে হয়। কারণ, তাতে পরের যাত্রা হয়তো ভঙ্গ হয়, কিন্তু নিজের শরীরে ভয়ঙ্কর ভাইরাস কিংবা ব্যাকটেরিয়ার দখলদারি বেড়ে যেতে পারে। আমার মনে হয়, এই হিসাবটা ঠিকঠাক না করতে পারলে পরিস্থিতি অনুকূলে আসার পরিবর্তে প্রতিকূলে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে। এক্ষেত্রে 'দশচক্রে ভগবান ভুত হওয়ার' বিষয়টিও মাথায় রাখার প্রয়োজন খুব বেশি বলেই আমি মনে করি। যারা প্রগতিশীল নয়, বলে এতদি...

বিজেপি ও আরএসএস কি আলাদা?

বিজেপি ও আরএসএস কি আলাদা? বিজেপি ও আরএসএস-এর রসায়ন সম্পর্কে সম্যক অবহিত আছেন, এমন মানুষদের সবাই জানেন বিজেপির সঙ্গে আরএসএস-এর গভীর সম্পর্কের কথা। এবং তাঁরা এটাও জানেন যে, আরএসএস দ্বারা বিজেপি নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হয়। তাই এই দুই সংগঠনকে আপাতদৃষ্টিতে আলাদা মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এরা আলাদা নয়। বরং এরা একে অপরের পরিপূরক। বিস্তারিত দেখুন এখানে ক্লিক করে

বিজ্ঞান শিক্ষার পরিবর্তে ধর্মশিক্ষার প্রচলন ও তার পরিণতি

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্ম শিক্ষার প্রভাব দেশের বড় বড় বিজ্ঞান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেভাবে বেদ ও পুরাণসহ ধর্মশাস্ত্র পড়ানোর ধুম লেগেছে তাতে ভারতবর্ষ খুব তাড়াতাড়ি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মত অশিক্ষার কানাগলিতে ঢুকে যাবে। এভাবে চলতে থাকলে,বলা ভালো যেতে বাধ্য হবে। শিবপুর আই আই ই এস টি তে যেভাবে বেদ ও পুরাণ ভিত্তিক কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে তাতে এই আশঙ্কা প্রকট হয়ে উঠছে। সেই সঙ্গে গোলওয়ালকরের ছবি ও বই রেখে যেভাবে বিচ্ছিন্নতা ও সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন মতাদর্শকে হাইলাইট করা হচ্ছে তাতে ভারতের ভবিষ্যত দুর্দশার রূপটি স্পস্ট হয়ে উঠছে। বিস্তারিত পড়তে এখানে ক্লিক করুন ফেসবুকে দেখুন এখানে ক্লিক করে