বামপন্থীদের ব্যর্থতার কারণ ও তাদের করণীয় কী?
১) আমাদের উপর জনগণ আস্থা রাখতে পারেনি কেন?
ক) বামপন্থী নীতি কী, আদর্শ কী, কীভাবে এই নীতি সাধারণ ফেটে খাওয়া মানুষ এবং মধ্যবিত্তের সত্যিকার উপকার করতে পারে তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়নি।
খ) সাধারণ মানুষের কাছে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে ডানপন্থী রাজনীতির যে পার্থক্য রয়েছে সেটা পরিষ্কার নয়।
গ) গদি মিডিয়ার প্রোপাগান্ডা মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। এই মিথ্যা প্রপাগান্ডার কাউন্টার করার ক্ষেত্রে আমাদের প্রচন্ড ঘাটতি রয়েছে।
ঘ) তৃণমূল স্তরে ইয়াং জেনারেশনের (যারা কম লেখাপড়া জানেন কিংবা প্রায় জানেন না) কাছে আমাদের ভাবনা তেমন ভাবে পৌঁছাতে পারিনি। আমাদের মিছিলে তাদেরকে সেভাবে হাঁটাতে পারিনি।
ঙ) হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণ তীব্র আকার ধারণ করেছে এবার। এই মেরুকরণকে আটকানোর গুরুত্ব সম্পর্কে আমাদের মধ্যে অস্পষ্টতা আছে। এটা আটকাতে না পারলে আমাদের আন্দোলনের প্রভাব এবং তার ফলাফল যে বিজেপির ঝুলিতে যাবে এবং এর ফলাফল বামপন্থীদের জন্য যে ভয়ংকর হবে—এ সম্পর্কে তৃণমূল স্তরের নেতা কর্মীদের চেতনায় ঘাটতি আছে।ফলে এই মেরুকরণের বিরুদ্ধে কোন কাউন্টার প্রচার যুক্তি ও তথ্য দিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়নি।
চ) বিজেপির প্রকৃত চরিত্র মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের ঘাটতি আছে। তৃণমূল ও বিজেপি দুইয়ের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে অনিবার্য কারণে আমাদের আক্রমণের মূল লক্ষ্য হিসেবে বিজেপির তুলনায় তৃণমূল বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে বিজেপির প্রকৃত চরিত্র তুলে ধরার ক্ষেত্রে ব্যাপক ঘাটতি থেকে গেছে, যেটা বিজেপির প্রতি সাধারণ মানুষের একটি সফট সমর্থন তৈরি হয়েছে।
২) মহিলাদের ভোট এত ব্যাপক সংখ্যায় বিজেপির দিকে যাওয়ার কারণ :
ক) সাধারণ খেটে খাওয়া এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ রাজনীতিকে বোঝার চেষ্টা করেন গদি মিডিয়ার কাছ থেকে। এই মিডিয়ার প্রচার ৩০০০ হাজার টাকার প্রতিশ্রুতি তাদের সমর্থনকে বিজেপির দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিজেপির আসল রূপ এই মানুষগুলো কখনো দেখেনি। ফলে তারা বিজেপির প্রতিশ্রুতির প্রতি আস্থা রেখেছেন। আমরা বামপন্থীরা এই প্রতিশ্রুতির ফাঁকফোকর তাদের সামনে তুলে ধরতে পারিনি।
খ) মহিলাদের ধর্মের প্রতি গভীর আস্থা থাকে। আরএসএসের মাধ্যমে তাদের এই আস্থাকে বিজেপিমুখী করে তোলার চেষ্টা সফল হয়েছে।
৩) আমাদের প্রচারে বহু মানুষ থাকলেও ভোটের হার এত কম কেন?
আমাদের প্রচারে যে মানুষগুলো প্রতিদিন হাটেন তারা আসলে নীতি এবং আদর্শগতভাবে বামপন্থী মানুষ। তাদের সংখ্যা আমাদের আমাদের পশ্চিমবঙ্গে একেবারে কম নয়। তাই বামপন্থীদের মিছিলে তারা হাটেন। কিন্তু মিডিয়ার কল্যাণে তাদের মধ্যে ধারণা তৈরি করা হয় যে বামপন্থীরা এখানে শক্তিশালী নয়, এদের দিয়ে তৃণমূলকে সরানো সম্ভব নয়। তাই অনেক মানুষ তৃণমূলের প্রতি যে ক্ষোভ, সেই ক্ষোভ প্রকাশ করতে অনেকেই বিজেপিকে বেছে নিয়েছেন। এই প্রবণতা অনেকদিন ধরেই আছে।
৪) এখনই কোন কোন কাজে অগ্রাধিকার দিতে হবে?
তৃণমূল দুর্বল হয়েছে। দিমুখী লড়াইয়ের যে সমস্যায় বামপন্থীরা ভুগছিলেন, সেটার অবসান ঘটার সুযোগ এসেছে। এখনই প্রধান বিরোধী দলের জায়গায় পৌঁছে যাওয়াটার জন্য যা যা করা জরুরী সেগুলোতে মনোযোগ দিতে হবে।
ক) হকার উচ্ছেদ বিজেপি না করে পারবে না। খেটে খাওয়া মানুষ বিপদে পড়বেন। সর্বশক্তি দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানো দরকার। বিজেপির প্রতি তাদের যে বিশ্বাস তৈরি হয়েছিল এখনই তা ভেঙে দেয়ার জন্য মাঠে নামতে হবে।
খ) সংখ্যালঘু মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে তৃণমূলের দ্বিচারিতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই সুযোগে তাদের পাশে দাঁড়ানো দরকার।
- ১) ভোটার লিস্টে তাদের নাম পুনরায় তোলা,
- ২) বিভিন্ন জায়গায় তাদের বিরুদ্ধে যে অন্যায় অত্যাচার শুরু হয়েছে সেগুলো খুঁজে খুঁজে বের করা এবং তাদের পাশে দাঁড়ানো।
গ) সেই সঙ্গে বিজেপি এবং তৃণমূলের যে নীতি, তা যে ভুল এবং সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের বিরুদ্ধে। তা যুক্তি এবং তথ্য দিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
- ১) বুথ লেভেল-এর সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং
- ২) সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে।
ঘ) নির্ভয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে বামপন্থী নেতাকর্মী এবং সমর্থকদের মিশতে হবে এবং একটু একটু করে উদাহরণ দিয়ে বিজেপির আসল চরিত্র তুলে ধরতে হবে। সেই সুযোগ এখন এসেছে। এটাকে হাতছাড়া করা যাবে না।
- ১) আজ তৃণমূল মুছে যাবার উপক্রম হয়েছে। এ কাজ সম্পন্ন হলে বামপন্থীরাই হবে বিজেপির পরবর্তী টার্গেট এটা বাম নেতাকর্মীদের এখনই বুঝে নেওয়ার দরকার আছে। এবং সেই জায়গায় যাতে বিজেপি কোনদিন যেতে না পারে তার জন্য এক্ষুনি বামপন্থীদের আন্দোলনের তীব্রতাকে বাড়াতে হবে।
- ২) সহজ সরল ভাষায় বামপন্থা কী, কেন সাধারণ মানুষের কাছে এর কোন বিকল্প নেই তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এক কথায়, তাদের শ্রেণি সচেতন করে তুলতে হবে।
- ৩) বিজেপি যে ধার্মিক নয়, ধর্ম ব্যবসায়ী এবং ধর্মকে ব্যবহার করে এরা যে দেশের সাধারণকে বোকা বানিয়ে সাধারণ মানুষের সম্পদকে তা গোটা কতক ধনী বণিকদের হাতে তুলে দিতে চাইছে, যুক্তি ও তথ্য দিয়ে মানুষের কাছে তুলে ধরতে হবে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন