সাফল্যের মূল চাবিকাঠি কী? - লিখছেন আলী হসেন।
বিদ্যা ও বুদ্ধির সমন্বয়েই গড়ে ওঠে সাফল্যের ইমারত। অর্থাৎ সাফল্যের মুল চাবিকাঠি হল বিদ্যা ও বুদ্ধির সমন্বয় ঘটানোর সক্ষমতা। তাই সাফল্য লাভ করতে হলে, শুধু বিদ্যার্জন করলেই হবে না, বুদ্ধির গোড়ায় শানও দিতে হবে।সেটা কীভাবে সম্ভব?
বুদ্ধির গোড়ায় শান দিতে দরকার একটি যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক মন বা চিন্তন ক্ষমতা যা সবসময় স্বাধীন, সক্রিয় ও নিরপেক্ষ থাকে। এই ধরনের বুদ্ধি বলে দেয় তৃতীয় এক শক্তির অস্তিত্বের কথা, যার পোশাকি নাম হল পরিশ্রম। এই পরিশ্রমের ভিত্তি যদি হয় সততা ও বুদ্ধিদীপ্ত, তবে সাফল্য নিশ্চিত করা যায় এবং তা হয় দীর্ঘস্থায়ী।
এই ধরণের বুদ্ধি দ্বিতীয় একটি হাতিয়ার সম্পর্কেও মানুষকে সচেতন করে তোলে। আর তা হল সফল মানুষের সান্নিধ্য ও তাঁর পরামর্শ গ্রহণের সদিচ্ছা।
এই বুদ্ধিই তৃতীয় অর্থাৎ আরও একটি শক্তিশালী হাতিয়ারের কথা স্মরণ করায়। এই হাতিয়ার হল চাপমুক্ত মানসিক শক্তি। মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তা এমন এক মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন যা সমস্ত শারীরিক সক্ষমতাকে বিধ্বস্ত করে দেয়। ফলে পরিশ্রম করার সাহস ও শক্তি স্থবির হয়ে পড়ে। সুতরাং কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করার সময় দুশ্চিন্তা নয়, ঠান্ডা মাথায় বিদ্যা ও বুদ্ধির যৌক্তিক ও বিজ্ঞানসম্মত প্রয়োগই একমাত্র হাতিয়ার —এই বিশ্বাস ধারন করা দরকার।
বিদ্যা ও বুদ্ধি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারকে সক্রিয় করে তোলে। আর সেটা হল সময় ব্যবস্থাপনা বা টাইম ম্যানেজমেন্ট করার ক্ষমতা। এই ক্ষমতা বলে দেয়, কোন্ কাজ কখন করা উচিত এবং কতটা গুরুত্ব দিয়ে করা উচিত। এই কখন ও কতটা — এই শব্দ দুটির যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া ও তাকে কাজে লাগানোর চেষ্টার মধ্যেও রয়েছে সাফল্যের সম্ভাবনার পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষমতা। এই সময় ব্যবস্থাপনা একজন মানুষ যত নিখুঁতভাবে করতে পারেন, তিনি তত দ্রুত সাফল্যের শীর্ষ ছোঁয়ার সক্ষমতা অর্জন করেন।
ধরুন, আপনি একজন ছাত্র। অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির মধ্যে আপনার অবস্থান। একজন স্বাভাবিক মানুষের মতো আপনারা মধ্যেও এই সময় অনেক চাহিদার জন্ম হবে। সেই চাহিদাগুলোর কোনটাই অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু প্রশ্ন হল, কোন চাহিদা পূরণের জন্য আপনি কতটা সময় দেবেন, অথবা এখনই সেই চাহিদা পূরণের চেষ্টা করবেন কিনা। বলা ভালো, করা উচিত কিনা। প্রেম করার ইচ্ছা, সিনেমা দেখার ইচ্ছা, ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছা, নারী বা পুরুষসঙ্গ পাওয়ার ইচ্ছা, লেখাপড়া করার ইচ্ছা, মানুষের উপকার করার ইচ্ছা ইত্যাদি। আপনি যদি সময় ম্যানেজমেন্ট বোঝেন, তাহলে এই বিষয়গুলোর মধ্যে আপনি কোন্ ক্ষেত্রে কতটা সময় দেবেন অথবা আদৌ দেবেন কিনা, তা ঠিকঠাক বুঝতে পারবেন। এবং এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবেন লেখাপড়ার প্রতি। কারণ, লেখাপড়া এমন এক মাধ্যম যা আপনাকে বিদ্যা ও বুদ্ধি অর্জনের কাজকে দ্রুত ও সহজ করে দেবে। মনে রাখতে হবে, বিদ্যা ও বুদ্ধির যৌক্তিক ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে অর্জিত সক্ষমতাকেই বলে শিক্ষা। একমাত্র এই ধরণের শিক্ষাই সাফল্যকে নিশ্চিত করতে পারে।
আরও পড়ুন শিক্ষিত হওয়ার উপায়
আর একদমই যে ইচ্ছাকে প্রশ্রয় দেবেন না, তা হল নারী বা পুরুষসঙ্গ পাওয়ার ইচ্ছা। অন্যগুলোকে যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণ করবেন। এই নিয়ন্ত্রণ যত বাড়বে, আপনার সাফল্যের সম্ভাবনার হার তত বাড়বে।
সুতরাং একজন বুদ্ধিমান ও প্রকৃত শিক্ষিত মানুষই একমাত্র পারেন সাফল্যের এই হাতিয়ারগুলোকে চিনতে এবং তাকে প্রয়োগ করার কৌশল করায়ত্ত করতে। আর এগুলোর যোগফলই হল সাফল্য।
আমরা কি এই পথে হাঁটি?
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি সবাই এই পথে হাঁটি? উত্তর হল, না। কিন্তু কেন?
এখানেও সেই যুক্তি বুদ্ধির সমস্যা। যুক্তি বুদ্ধি যদি যুক্তিবিজ্ঞান সম্মত পদ্ধতিতে অর্জিত না হয় তবে তা আমাদের সঠিক পথ দেখাতে পারে না। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। ধরুন, আপনি দশম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি অথবা গ্রাজুয়েশন লেভেলে পড়াশোনা করছেন। আপনি দেখছেন চারপাশে অনেক মানুষ অকালে মারা যাচ্ছেন। আপনি প্রতিদিন শুনছেন, হওয়া-মরায় আপনার কোন হাত নেই, সবই ঈশ্বরের হাতে। আজ আছেন, কিন্তু কাল থাকবেন কিনা আপনি জানেন না। এই ভাবনা আপনার যুক্তি বুদ্ধিতে এভাবে কাজ করে — যত তাড়াতাড়ি পারো, জীবনে ভোগ করার যাবতীয় বিষয়কে করায়ত্ত করো এবং উপভোগ করে যাও। এই ভাবনা থেকেই একজন ছাত্র বা ছাত্রী লেখাপড়াকে লাঠে তুলে ভোগের পিছনে ছুটতে থাকে। বাবার পকেটের টাকা খরচ করে, লেখাপড়া নয়, সখ মেটানোয় ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
এই ভাবনার দুর্বলতা ধরার জন্য দরকার প্রখর যুক্তি বুদ্ধির প্রয়োগ যা একমাত্র যুক্তিবিজ্ঞান সম্মত পদ্ধতিতে অর্জন করা যায়। একজন মানুষ যখন মরে যাওয়ার ভয়ে লেখাপড়ার চেয়ে তাৎক্ষণিক ভোগের পিছনে ছোটে, তখন তার মাথায় এটা আসে না, যে —
- ১) অকালে যত মানুষ মারা যাচ্ছেন, তার চেয়েও অনেক বেশি মানুষ নানান দুঃখ কষ্ট ও অভাব অভিযোগ নিয়েই বেঁচে আছেন দীর্ঘ জীবন।
- ২) এক্ষেত্রে কতদিন বাঁচবো যেমন আমি জানি না, অল্প দিনের মধ্যে মারা যাবো কিনা — সেটাও তো জানি না।
এখন, মরে গেলাম তো চুকে গেল। দুঃখ কষ্ট ভোগের কোনো সম্ভাবনাই নেই। কিন্তু যদি বেঁচে যাই সত্তর বছর (দেশের মানুষের গড় আয়ু)! এবং ভালো ভাবে বাঁচার জন্য প্রকৃত শিক্ষিত হয়ে ওঠার চেষ্টা না করি, তবে তো ভয়ংকর দুঃখ কষ্ট নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দীর্ঘ জীবন কাটাতে হবে। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যাবুদ্ধির অধিকারী মানুষ (শিক্ষার্থী) এটা বুঝবেন, এখনই ভোগের পিছনে নয়, অর্জনের (শিক্ষা) পিছনে ছুটতে হবে এবং তিনি লেখাপড়াকেই অধিক সময় ও গুরুত্ব দেবেন।
এক্ষেত্রে অধিকাংশ মানুষ যে রাস্তা নেন তা হল অনৈতিক এবং চালাকির মাধ্যমে যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা ও ভোগ্য পণ্য করায়ত্ব করা। এই চেষ্টা সাফল্যকে আটকে দেয়। যে সাফল্য আসে তা ক্ষণস্থায়ী হয় এবং পরবর্তী জীবনে এই সাফল্যই বড় ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত হয়।
----------xx-----------
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন